নানা নাতির বিয়েঃ এবং আমার দু’টো কথা !!

৮ম শ্রেণীতে পড়ুয়া ফাতেমা নামের একটি মেয়ে শামছুদ্দিন নামের ৬৫বছরের এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছে।
কয়েকদিন যাবৎ সেই খবর আর ছবি ফেসবুক ঘুরছে। আজ তার একটা ভিডিও দেখলাম মেয়েটিকে প্রশ্ন করে কিভাবে নাজেহালেই না করা হচ্ছে।
এবং সেই পোস্টগুলোর মধ্যে যার পর নাই বাজে বাজে কমেন্টস যা দেখলে সহজেই অনুমেয় যে আমরা এখনো কতটা অসভ্য!!

এখন মূল কথায় আসি :
—————-
বিয়ে হলো একটি সামাজিক বন্ধন যা প্রাচীন কাল হতেই আমাদের সমাজে শুধু প্রচলিত প্রথাই নয় ধর্মীয় ও আইনি বিধান দ্বারাও স্বীকৃত। আমাদের দেশে প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়ে অথবা অন্য যে কোন বয়সের নর-নারী (মেয়েদের ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর ) নিজেদের পছন্দের পাত্র-পাত্রীকে বিয়ে করতে পারবেন।

সেখানে আইনী বা ধর্মীয় কোন বিধি নিষেধ নেই।
♦ফাতেমা নামের মেয়েটিকে যেভাবে প্রশ্ন করা হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে ইভটিজিং,এবং আইনের পরিপন্থী।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আমরা নিজেরা সমাজে কতটা ভালো কাজ করতে পারছি বা করছি সেদিকে কোন খেয়াল তো দুরের কথা উপরন্তু অন্যের চরিত্র হননে আদা জল খেয়ে লেগে যাচ্ছি। তাও যদি ন্যায় বা আইন সঙ্গত হতো তবে একটা কথা ছিলো।

৮ম শ্রণী পড়ুয়া মেয়ের বয়স আইন সিদ্ধ নয়, কিন্তু এটাও ঠিক যে আমাদের সমাজে অহরহ ছেলে মেয়ে আছে যাদের পড়া শোনায় বিশাল গ্যাপ থাকে বা একটু বয়স হওয়ার পরে স্কুলে যায়। সেটা সামাজিক বা পারিবারিক, আর্থিক বিভিন্ন কারণেই হয়ে থাকে। ফাতেমাকে দেখেও অতটা বাচ্চা মেয়ে মনে হয় না। সে যাই হোক,,,,,,,,,,।

বিয়েটা হলো এমন একটা মৌলিক অধিকার যে, কে কাকে নিয়ে ভালো থাকবে, কার সাথে সুখী হবে, কার সাথে সারাটা জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেবে অর্থাৎ ঘর বাঁধবে। এটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার।
কেউ খারাপ জেনেও যদি (সবার মতামতের উর্ধ্বে গিয়ে) কাউকে বিয়ে করে সেখানে আইনি কোন বাধা নেই। এখানে ব্যক্তির মতামতই মুখ্য।

যখন দেখি শিক্ষিত মানুষেরাও এমন ব্যক্তিগত ও মৌলিক ব্যাপার নিয়ে সমালোচনা, কানাঘুষা করছেন তখন সত্যিই বড় আফসোস হয় এই ভেবে যে সভ্য হতে আমাদের আর কত যুগ,শতাব্দি অপেক্ষা করতে হবে!!

আর অবাক হই এটা ভেবে যে,,,,,,

যখন আমাদের প্রিয় নবীজি (সাঃ) ২৫ বছর বয়সে ৪০ বছর বয়স্কা বিবি খাদিজা (রাঃ) কে বিয়ে করেছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি কুমারী,কিশোরী আয়েশা (রাঃ) কে ও বিয়ে করেছিলেন।এবং ধর্ম আমাদের তাঁর দেখানো পথেই অনুসরণ করতে বলে।
আর আমাদের দেশের প্রচলিত আইন তো বিয়ের ব্যাপারটাকে সহজ এবং স্বচ্চ করে রেখেছে। প্রাপ্ত বয়স্ক দুজনের সম্মতি হলে আর কারো কিছুর প্রয়োজন হবে না, অনায়াসে বিয়ে করা যাবে।
অথচ তখনো আমরা বিভিন্ন বিয়ে নিয়ে প্রায়শই মুখরোচক গল্প বা ক্ষেত্র বিশেষ সেই মানুষগুলোকে অপদস্থ করতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করি না।

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহম্মেদ যখন শাওনকে বিয়ে করলেন, সুবর্ণ মোস্তফা সৌদকে কিংবা মিথিলা সৃজিতকে,,,,,,,,, অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো মানুষগুলো যেনো পেটের ভাত হজম করার টনিক খুঁজে পেয়েছিল।

মুহূর্তের মধ্যে কিছু মানুষের বিশেষজ্ঞ, গবেষক,দার্শনিক হয়ে উঠা দেখে তো আমাদের মতো কিছু সাধারণ মানুষের টাস্কি খাওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না। যে কথা বলতে জানে না সে ও তু তু করে দু’চারখান হাদিস শোনিয়ে দেবার চেষ্টা করে (একান্তই নিজস্ব)।
পোশাকের জগতে সুপরিচিত ব্র্যান্ড আড়ং এর কর্ম কান্ড নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি জনাব ফজলে হাসান আবেদের মেয়ে কোন ধর্মের ছেলেকে বিয়ে করেছেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয় কোন ধর্মের মেয়ে বিয়ে করেছেন। এসব নিয়ে কি কাঁদা ছুঁড়াছুড়িই না আমরা করেছি।

♦ব্যাক্তিগত আক্রমন যে আমাদের নিজের অযোগ্যতাকেই প্রমাণ করে, এটা আমরা কখনো ভেবে দেখি না।

কারো বিয়ের ব্যাপারে কথা বলা একেবারেই ঠিক নয় বলে আমি মনে করি। কারো বিয়েতে যদি কোন অসঙ্গতি থেকেও থাকে সেটা নিতান্তই তাদের ব্যাপার। ভালো-মন্দের সাফারার তারাই হবে। এই সমস্যা আপনার বা আমার নয়। যদি সমস্যা নিয়ে আপনার কাছে আসে কেবল তখনি দু’টো কথা আপনি বলতে পারেন, নয়তো নয়।

অনধিকারচর্চা কোন ভাবেই কাম্য হতে পারে না।

♦ এখন আমার প্রশ্ন মানুষের একান্তই ব্যাক্তিগত ব্যাপার যদি আইনের পরিপন্থী না হয় তবে আপনার আমার এত এলার্জি কেনো বলতে পারেন??

সমাজের এত এত অসঙ্গতি আর বিশৃঙ্খলা রেখে কে কার সাথে ঘর করতে পারবে বা পারবে না,অথবা কেনো করলো এমন বিয়ে । এটা কি আলোচনার বিষয় হতে পারে??? কারা করছে এগুলো ? এই আমরা, আমাদের মতো শিক্ষিত নামধারীরা, ফেসবুক শিক্ষিতরা।
কারো সম্পর্কে কিছু বলার আগে অন্তত তিনবার ভাবুন ।
১. ব্যাক্তির অপরাধ প্রমাণিত কি না বা কাজটি অপরাধের মধ্যে পড়ে কি না
২.আপনার কথায় বিনা অপরাধে তিনি অপদস্তু হবেন কি না বা তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে কি না।
৩. আপনার ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে অযথাই তিনি ঘরে বাইরে হয়রানীর শিকার হবেন কি না।

এর একটিও যদি না হয় তবে আপনি সমালোচনা করতেই পারেন এবং তা যেনো হয় গঠনমূলক সে দিকটায় একটু খেয়াল রাখবেন।

আমরা মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নই। তাই আসুন নিজের মধ্যে সচেতন হওয়ার চেষ্টাটুকু পোষণ করি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতনতার কোন বিকল্প নেই।

আমার লিখা বা কথায় কিছু ভুল হয়ে থাকলে আমি সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

মহামারীর এই সময়ে প্রয়োজন ছাড়া আসুন ঘরেই থাকি।
নাহিন শিল্পী
শিক্ষক, সমাজসেবী
ময়মনসিংহ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *