করোনাতে স্মৃতিচারণঃ “ব্যাংকক টু বম্বে”২০০৪

বম্বের হিন্দুজা হাসপাতালে রাজীব সাহেব এর প্রথম অপারেশন হয়। দুইমাস পর ঢাকা এসেও যখন রুগি সুস্থ হচ্ছে না,সিদ্ধান্ত হলো ব্যাংকক নিয়ে চলো। পাঁচ ছয়দিন পরেই আবারও ঘর বাড়ী বাচ্চা সব ফেলে ব্যাংকক রওয়ানা দিলাম। হসপিটালেরই হোটেল এ উঠি।

পরের দিন যখন ডাক্তার দেখাই,ডাক্তার বললেন,অপারেশন এর পর বায়োপসি র একটা স্লাইড হয় ওটা ছাড়া চিকিৎসা সম্ভব না।এখন উপায়? রাতের মধ্যে সিদ্ধান্ত হলো উনি ব্যংকক থাকবেন, আমি বম্বে যাবো। টিকেট এর জন্য যোগাযোগ করলাম। সরাসরি বম্বের কোন টিকেট নেই।সিংগাপুর হয়ে বম্বে যেতে হবে। টিকেট নিয়ে রাস্তায় বের হলাম,অবৈধ কোন বাংলাদেশী পাওয়া যায় কিনা।সয়ো সিক্স এ মনিকার খাওয়ার হোটেল। বসে অপেক্ষা করি কারা খেতে আসে দেখি।

আমার উদেশ্য ভিন্ন। যদি কোন অবৈধ বাংগালী পাওয়া যায়। এক বাংগালী ছেলে দুপুরে খেতে আসে। পরনের কাপড় মলিন। ওর পাসে গিয়ে বসে কথা বলে বুঝলাম হবে। তুমি সারাদিন কাজ করে যা পাও আমি তার দিগুণ দিব, একজন পেসেন্ট এর সাথে তিনদিন থাকতে হবে। ছেলেটা রাজি হলো। দুজনের জন্য যা যা খাবার লাগে সব কিনে গুছিয়ে দিয়ে আমি বম্বে রওয়ানা দিলাম একা। এত বড় জার্নি একা কোনদিন করিনি, অনেকটা নার্ভাস।

এয়ারপোর্ট ঢুকেই রি এন্ট্রি ভিসা নিতে হলো।ওখানে ভিসা নিতে গিয়ে কেন, কি কারনে কবে নানান প্রশ্ন। সিংগাপুর নেমে ফ্লাইট চেঞ্জ করে বম্বের ফ্লাইট ধরি। এখানে একটু কথা না বললে গল্প অসমাপ্ত থেকে যায়। দীপ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। আমার পড়াশোনা সেই অল্প। স্কুল টিচার ইংরেজিতে কথা বলে,আমি কিছু বুঝিনা। ছোট ক্লাসের পড়াও অনেক কঠিন লাগে। বাবুর আব্বা আমি পড়াশোনা শুরু করতে চাই,বাচ্চাদের স্কুলের কিছু বুঝি না,বাসায় পড়াতে পারিনা।

গম্ভীর গলার আওয়াজ,তোমার পড়তে হবেনা, মাষ্টার রেখে দাও যে কয়জন লাগে। মাস্টার মাইন্ড স্কুলের টিচার বেশ বয়স্ক, সুলতানা মিস এর সাথে দেখা করি। বলি আমার বাচ্চাকে পড়াবেন।উনি রাজি হন। পরের দিন আসলে বলি,মিস বাচ্চাকে পড়াতে হবেনা, আমি আপনার কাছে পড়বো। মিস মহা খুশি। শুরু করলাম দীপএর পড়া, কথা বলার প্রেক্টিস একসাথে দৌড়াতে থাকি। আবার দীপকেও পড়া-ই। সেবার দীপ ক্লাস এ সেকেন্ড হলো। মিস আমাকে ইংরেজিতে যা যা গালি আছে সব শিখিয়ে দেন। মিস মহা বিপদে পড়ে গেলেন,আমাকে যদি কেও ইংরেজিতে বকা দেয় আমারও তো রিপ্লাই দিতে হবে নাকি? এক নাগাড়ে গালি শুনে যাওয়াটাও অপরাধ কি বলেন? আচ্ছা আমি আপনাকে নতুন নতুন ওয়ার্ড এর কথা মালা শিখাবো।

একদিন ইংরেজি বকার উত্তর দিয়েছিলাম। বাকি জীবনে আর কোনদিন ইংরেজিতে বকা দেওয়ার সাহস করেননি। দীপএর নাম দিয়ে আমার পড়াশোনা চললো। তখন মনে হলো আমার এই চুরি করে পড়াশোনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখলো।পরবর্তীতে দেশের বাইরে গেলে উনার বৃটিশ ইংরেজি মানুষ বুঝতো না। তখন আমাকে বলতেন,তুমি কথা বল আমার কথা বুঝে-না। আমি আমার ১২ আনা ইংরেজি শুরু করতাম ওরা বুঝতো। তো ব্যাংকক থেকে বম্বে যাচ্ছিলাম।

বম্বে পৌঁছাতে রাত দুই টা। হিন্দি সিনেমায় দেখি মেয়েদের কেমন করে ধরে নিয়ে যায়,এই সব ভেবে ঘামতে শুরু করি। বম্বে ইমিগ্রেশনঃ আপনি একপাশে দাড়ান আপনাকে এখন ছাড়া যাবেনা, কেনো? আপনার বারবার ইন্ডিয়া আসা সন্দেহজনক। তখন দীপ আসাম এর আসাম ভেলী স্কুল এ পড়ে। ,যার কারনে প্রতি মাসে আমাকে যেতে হতো। সব বুঝিয়ে বললাম।কিছুই শুনতে চায়না। আমি অফিসার কে বললামঃ অফিসার, আমাকে আটকে রেখে আপনি ভুল করছেন।

আমি একজন ক্যানসার পেসেন্ট এর কাজে এখানে এসেছি। আমার প্রতিটি মিনিট মুল্যবান। আপনার কারনে যদি পেসেন্ট এর কিছু হয় আমি আপনাকে ছাড়বোনা। তখন অফিসার আমার দিকে অল্পক্ষন তাকিয়ে বলেন, আচ্ছা যান। সাহস করে বাইরে এসে গাড়ি নিয়ে রওয়ানা দিই। ড্রাইভার এর সাথে গল্প করতে থাকি,এমন ভাব করি আমি পুরা বম্বে চিনি।

ভিতরে ভয় কাজ করছিলো,চেনা হোটেলটাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না।কারণ হোটেল এর সামনেই কয়েকজন মাতাল লোক গন্ডগোল করছিলো। ভয়ে আরও ঘাবড়ে যাই।অনেক পরে যখন পেলাম। এত ভোরে একা কোন মহিলাকে রুম দেওয়া যাবেনা, বাংলাদেশীদের তো আমরা রুমই দিইনা, ক্লান্ত শরীর আর চলে না।

সোজা হয়ে দাড়ানোর শক্তি টুকুও যেন নাই। হঠাৎ মনে হলো,আপনি পুরানো রেজিষ্ট্রেশন খাতা বের করেন প্লিজ। মাসের এত তারিখ এত সাল এই হোটেল এ ছিলাম,তখন যদি থেকে থাকি এখন কেনো রুম দিবেন না? ম্যনেজার এর দয়া হলো,খাতা খুঁজে বের করলেন রুম দিলেন।কিন্তু বিধি বাম,পরীক্ষা আরও বাকি। মেডাম আমার পুরা হোটেল বুকিং নেওয়া। দুইটা ঘন্টা আপনি রেস্ট নিতে পারেন। “সকালের আলো ফুটলেই আমি চলে যাবো। “ভোরে নিউজ পেপার দেওয়ার জন্য বেয়ারা রুম নক করে।

আমি ভেবেছিলাম আজকে আমি শেষ। গলা শুকিয়ে কাঠ।কোনমতে বলি পেপার লাগবে না। ভয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুম আর হলো না। আলো হতেই বের হয়ে টেক্সি নিলাম যুহু বিচ। এত ভোরে ডাক্তার চেম্বার খুলবে না, সমুদ্রের পাড়ে একা বসে কত কথা মনে নাড়া দিয়ে যায়। চোখের পানিটুকু বালু চরে পড়ে নিমেষে শুকিয়ে যায়।

ডাক্তার এর সাথে দেখা তো হলোঃ দেবীজী সরি, আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারবোনা। বায়োপসি স্লাইট এর অর্থ মানব শরীর,এটা ফ্লাইট এ কেরি করা নিষেধ। হাসপাতাল থেকেও দেওয়া নিষেধ। ডাক্তার আমি ওটা না নিয়ে খালি হাতে ফিরে যাবোনা। মানুষ বাঁচানোর জন্য আমি পৃথিবীর সব আইন অমান্য করবো, আমার মনে হয় আপনি ডাক্তার, আপনারও করা উচিৎ।

অনেক্ক্ষণ যুক্তি পাল্টা যুক্তির পর ডাক্তার রাজি হলেন। রাতে অনেক কষ্ট করে হোটেল এ রুম নিলাম।ভোর তিনটায় সিংগাপুর ট্রানজিট হয়ে ব্যাংকক। দুরু দুরু বুকে এয়ারপোর্টে যাই।

যাই হোক ব্যাংকক এর ডাক্তার দুইদিন পর আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এত তাড়াতাড়ি কি করে এই জিনিস আসলো? আমি এনেছি জেনে রাজীব সাহেব কে বলেছিলেনঃ বলেছিলেন আপনি ভাগ্যবান।

লেখকঃ “দেবী”,

ব্যবসায়ী, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *