অনলাইনে গরুর হাট: খামারের নিজস্ব সাইট থেকে বিক্রি হচ্ছে বেশি গরু

প্রথম সময় ডেস্ক:

কভিড-১৯ মহামারির বদলে যাওয়া সময়ে এবার অনলাইন পশুর হাট জমেও জমছে না। বিশেষ করে অনলাইনে গরু কেনায় ‘স্লটারিং সার্ভিস’ বা জবাই করে ফুড গ্রেডেড প্যাকেটে মাংস বাসার ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার নতুন সেবায় বেশ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ অনলাইনে গরু কেনার পর সেই গরু আর বাসায় নেওয়ার দরকার হবে না। অনলাইন হাটেই থাকবে। কোরবানি ঈদের দিন বাসায় একেবারে মাংস পেয়ে যাবেন। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন  জানিয়েছেন, এরই মধ্যে তাদের সাইট থেকে অনলাইনে মোট গরুর ৫০ শতাংশ বুকিং এসেছে। তবে উত্তর সিটি করপোরেশনের ডিজিটাল হাটের অন্যতম উদ্যোক্তা ও বাংলাদেশ ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ তমাল  জানিয়েছেন, তাদের এই হাটে সাড়া কম। মাত্র ১৫ শতাংশ গরু গত মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের হাট থেকে বিক্রি হয়েছে। ক্রেতাদের মূল্যায়ন থেকে দেখা যায়, অনলাইনে সাধারণ বাজারের চেয়ে দাম বেশি ধরা হয়েছে বলে অধিকাংশ ক্রেতার মত। তবে বিক্রেতারা বলছেন, দাম বরং সাধারণ বাজারের চেয়ে কম। কারণ, সাধারণ বাজারে হাসিল এবং পরিবহনের যে অতিরিক্ত খরচ, তা অনলাইনে নেই; বরং অনলাইনে রয়েছে ফ্রি হোম ডেলিভারি।

অনলাইনে অনেক বিক্রেতা, অনেক গরু :দেশে অনলাইন পশুর হাট নতুন নয়। ২০১১ সালে ‘সাদেক এগ্রো কোরবানি বাজার’-এর মধ্য দিয়ে অনলাইনে পশুর হাট শুরু হয়। এরপর কিছু হাট অনলাইনে প্রতিবছরই দেখা গেছে। তবে এ বছর মহামারির সময়ে সাধারণ বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় অনলাইন পশুর হাট বেশি জমতে পারে- এ আশায় এক লাফে প্রায় এক ডজন অনলাইন পশুর হাট খুলে গেছে। কয়েক ধরনের বাজার রয়েছে। একটি হচ্ছে উদ্যোক্তার নিজস্ব বাজার। যেমন সাদেক এগ্রো কোরবানি বাজার। এখানে সাদেক এগ্রো ফার্মে নিজস্ব গরু পাওয়া যায়। কিন্তু ডিজিটাল হাট হচ্ছে বিভিন্ন অনলাইন এবং বিক্রেতার সমাহার। এই মার্কেট প্লেস ব্যবহার করে তৃতীয় আরেকজন বিক্রেতার কাছ থেকে গরু কিনছেন। ডিজিটাল হাট সাধারণ হাটের মতোই অনলাইনে একটি জায়গা, যেখানে নানা ধরনের বিক্রেতা গরু নিয়ে আসছেন। আবার ই-অর্ডারের মতো কোরবানি শপে উদ্যোক্তারা বিভিন্ন স্থান থেকে গরু সংগ্রহ করেছেন। সেই একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে বিক্রি করা হচ্ছে।

ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ করে দেখা যায়, যেসব অনলাইনে নির্দিষ্ট ফার্মের গরু বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোর প্রতিই মানুষের আকর্ষণ বেশি। যেমন সাদেক এগ্রো ফার্মের প্রধান মোহাম্মদ ইমরান হোসেন জানালেন, গত ১১ জুলাই থেকে অনলাইনে বুকিং নেওয়া শুরু করেছেন। তাদের ফার্মের প্রায় দুই হাজার গরুর মধ্যে গত ২০ জুলাই পর্যন্ত এক হাজারের বেশি গরু বুকড হয়ে গেছে। এর ৬০ শতাংশ আবার ‘স্লটারিং’ বা জবাইসহ বুকড হয়েছে। তিনি জানান, এ বছর বড় গরুর চাহিদা কম, ছোট গরুর চাহিদা বেশি। ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকার মধ্যে যেসব গরু, সেগুলোই বেশি বিক্রি হচ্ছে। বুকড হওয়া গরুর মধ্যে ৯০ শতাংশের দাম দুই লাখের নিচে। ১০ শতাংশের দাম দুই লাখ থেকে চার লাখ টাকার বেশি।

ডিজিটাল হাটের ব্যাপারে মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ তমাল জানান, ডিএনসিসির ডিজিটাল হাটসহ অন্য যেসব হাট বা মার্কেট প্লেস আছে, সেগুলোতে যথাযথ সাড়া এখন পর্যন্ত মেলেনি। ডিজিটাল হাট থেকে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মাত্র ৩০০ গরু বুকড হয়েছে। অথচ হাটে গরু আছে দুই হাজারের বেশি। তিনি বলেন, মানুষ এখনও অনলাইন থেকে গরু কেনার সুবিধার বিষয়টি বুঝতে পারছে না। যে কারণে ডিজিটাল হাটসহ এ ধরনের সাইটগুলোতে এখন পর্যন্ত বুকিং হতাশাজনক। তবে ঈদ যত কাছে আসবে, বুকিং তত বাড়বে বলে তার প্রত্যাশা।সূত্র: সমকাল

আর বিভিন্ন সাইটে ক্রেতাদের রিভিউতে বলা হচ্ছে, অনলাইনে দাম বেশি রাখা হচ্ছে। মার্কেট প্লেস দারাজের গরুবাজারে একটা গরুর দাম এক লাখ ১৬ হাজার ২৪০ টাকা। নিচে প্রায় ১০টির বেশি মন্তব্য এসেছে। অধিকাংশই লিখেছেন, সাধারণ বাজারে এই গরুর দাম ৭৫ হাজার টাকার বেশি হবে না। একজন লিখেছেন, দাম দেখে হতাশ হয়েছেন। এখন সরাসরি হাটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, কিছু কিছু মার্কেট প্লেসে দাম বেশি লেখার কথা তারা নিজেরাও শুনেছেন। এ কারণে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে ই-ক্যাবের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, দাম যেন অবশ্যই যৌক্তিক এবং সহনীয় পর্যায়ে থাকে। তবে ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, অনলাইনে বরং গরুর দাম কম। বিশেষ করে সাধারণ হাটে হাসিল ও পরিবহন বাবদ অতিরিক্ত খরচ যোগ হয়, অনলাইনে হয় না। এ বিষয়টি বিবেচনায় আনলে দাম অবশ্যই সাধারণ হাটের চেয়ে কম। তিনি আরও জানান, ডিজিটাল হাটে ক্রেতারা জ্যান্ত গরুর ক্ষেত্রে ৪০০ কেজির নিচে প্রতি কেজি ৩৭৫ টাকা, ৪০০ থেকে ৫০০ কেজির মধ্যে প্রতি কেজি ৪২৫ টাকা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি বা তার বেশি ওজনের গরুর জন্য ৪৭৫ টাকা কেজি দরে কিনবেন। এটা সর্বোচ্চ দাম, এর ওপরে যাবে না।’

স্লটারিং সার্ভিস ঝামেলামুক্ত :বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোরবানির জন্য ‘স্লটারিং সার্ভিস চালু আছে। এবার বাংলাদেশেও এই অফার দিচ্ছেন অনলাইন পশুবাজারের উদ্যোক্তারা। মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ তমাল পুরো বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, এ বছর কভিড-১৯ মহামারির কারণে অনেক ভবনেই পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ কারণে এ বছর অনলাইনে ‘স্লটারিং সার্ভিস’ জনপ্রিয় হচ্ছে। তিনি জানান, অনলাইনে গরু কেনার ক্ষেত্রে ‘স্লটারিং সার্ভিস’ যুক্ত করে অর্ডার দিতে পারছেন গ্রাহকরা। এ ক্ষেত্রে গরু হোম ডেলিভারি করা হবে না। ২৮ জুলাই ক্রেতা অনলাইন বিক্রেতার কাছ থেকে গরুটি স্লটারিং সেন্টার বা জবাইখানায় নিয়ে যাবেন কিংবা নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্মতি দেবেন। জবাইখানায় গরু জবাই করে মাংস ফুড গ্রেডেড প্যাকেটে করে বাসায় দিয়ে আসা হবে। ক্রেতা নিজেও জবাই করার সময় স্লটারিং সেন্টারে উপস্থিত থাকবেন বা থাকতে পারেন। জবাইখানায় প্রক্রিয়াকরণের পর মাংস ক্রেতার বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। স্লটারিং সার্ভিসের জন্য গরুর মূল্যের সঙ্গে পৃথক সার্ভিস যুক্ত হবে।

মোহাম্মদ ইমরান হোসেন জানান, স্লটারিং সার্ভিসে প্রক্রিয়াজাত করে ক্রেতার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৩৭৫ টাকা কেজি দরে (জীবন্ত গরুর ওজন) হিসাব করে বিক্রি করা হবে। ক্রেতা যদি প্রসেস করে নিতে চান, তাহলে দামের ১৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ দিলে তা তার বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া হবে। ক্রেতা গরু কেনার সময় অনলাইনে যে ওজনের হিসাব দেখবেন, সে অনুযায়ী গ্রহণের সময় মাংস মেপে নেবেন। ফলে ক্রেতার প্রতারিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। যদি দুই কেজি মাংস কম হয়, তাহলে তার দাম ফেরত দেওয়া হয়; যদি দুই কেজি বেশি হয়, তাহলে দাম নেওয়া হয় না।

Advertisements

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *