চবি উপাচার্য কন্যার বিরুদ্ধে গাড়ি বিলাসের অভিযোগ!

অনলাইন ডেস্ক: নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের কন্যা টিনা শাহনাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম শহরের বাইরে বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় টিনা শাহনাজ তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ঘুরে বেড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি নিয়ে। টিনার প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

শুক্রবার (২৫ ডিসেম্বর) ডিনদের জন্য নির্ধারিত মাইক্রোবাস (চট্টমেট্রো- চ- ৫১-২৬০১) নিয়ে রাঙামাটি বেড়াতে গেছেন উপাচার্যের কন্যা টিনা শাহনাজের বন্ধুরা। ঢাকা থেকে আসা নিজের বন্ধুদের এই গাড়িতে রাঙামাটির বিভিন্ন পর্যটন স্পট ঘুরতে পাঠিয়েছেন তিনি। এ ঘটনা ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। রাঙামাটিতে ডিনদের গাড়ি নিয়ে উপাচার্যের কন্যার বন্ধু ঘুরতে দেখে গাড়িটির ছবি তুলে ফেসবুকে ছবি দিয়েছেন আইন অনুষদের এক শিক্ষার্থী।

অথচ কোনো অবস্থাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট গাড়ি রাঙামাটি যেতে দেওয়ার নিয়ম নেই বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় ট্রান্সপোর্টের ছোট গাড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. দিদার। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘৪৫ কিলোমিটারের বেশি দূরে আমরা কাউকে গাড়ি দিতে পারিনা। এর বেশি হলে উপাচার্য মহোদয়ের অনুমতি লাগে। শুধুমাত্র শিক্ষক ও কর্মকর্তাদেরই রিকুইজিশন সাপেক্ষে গাড়ি দেওয়া হয়। এ জন্য নির্ধারিত ফি নেওয়া হয়। তাছাড়া রাঙামাটিতে ছোট গাড়ি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
ডিনদের জন্য নির্ধারিত মাইক্রোবাস (চট্টমেট্রো- চ- ৫১-২৬০১) কিভাবে শুক্রবার রাঙামাটি গেল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে সব গাড়ি পরিবহন পুলেই আছে। কোনো গাড়ি রাঙামাটি যাওয়ার অনুমতি আমরা দেইনি।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের ওই শিক্ষার্থী তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে রাঙামাটির পর্যটন এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা ডিনদের জন্য নির্ধারিত একটি গাড়ির ছবি পোস্ট দিয়ে লিখেন, ‘এইটা চবির ডিনবৃন্দকে বহনকারী গাড়ি। রাঙামাটি আসছে ঘুরতে। ভুল ভাবছেন। শ্রদ্ধেয় ডিনদের কাউকে নিয়ে আসে নাই। এসেছে মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের স্নেহাস্পদ কন্যার ঢাকা থেকে আগত বন্ধুবান্ধবদের ট্যুরে (বিনা ভাড়ায়/ ভাড়ায়) খাটতে। শ্রদ্ধেয় রেজিষ্ট্রার মহোদয়ের মৌখিক/লিখিত অনুমতি নিয়ে। চিয়ার্স।’

এ বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে শুক্রবার সকালে রাঙামাটি ঘুরতে যাই। পর্যটন এলাকায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনদের একটি মাইক্রোবাস দেখে এগিয়ে যাই। চালকের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করি, কোন ফ্যাকাল্টির ডিন স্যার এখানে এসেছেন। চালক জানালো আমাদের, উপাচার্যের কন্যা টিনা শাহনাজের কিছু বন্ধু এসেছেন ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে। তাদের নিয়েই এই গাড়ি রাঙামাটি ঘুরতে এসেছে।’

এদিকে ওই ফেসবুক পোস্টে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সে পোস্টটিতে সমালোচনা করে কমেন্ট করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা। আবু হানিফ নামে একজন লিখেছেন, ‘পোলাপাইন বহুত বজ্জাত। শান্তিতে বেড়াইতে দিবে না’

ফোরকানুল আলম লিখেছেন, ‘উনি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই, বিটিভির চট্টগ্রাম কেন্দ্রের চুক্তিভিত্তিক প্রোগ্রাম প্রযোজক। মায়ের পদের সুবিধা একটু ভোগ না করলে কেমনে!!!’

সাঈয়েদ করিম নামে একজন লিখেছেন, ‘বাবা জাদু সোনা বলে বেশ ভোগবিলাসে ব্যস্ত তাইলে উনি!’ শাফায়েত উল্লাহ জিয়াদ লিখেছেন, ‘সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল’।

মাজহারুল ইসলাম রওনক লিখেছেন, ‘তরা এত বেরসিক কেন? ম্যামের মেয়ের বন্ধুরা ডিনের থেকে কম নাকী, শুধু রেললাইন নাই বলে তারা শাটল নিয়ে যেতে পারলো না’। আশিক রব্বানী লিখেছেন, ‘বিয়ে শাদির মৌসুমে ভাড়া দিলে প্রচুর টাকা আসতো।’

নাজমুল হাসান চৌধুরী লিখেছেন, ‘ধুর ব্যাটা, একটা গাড়িই তো দিছে। পুরা গাড়ির বহর তো দেয় নাই। তোরাও একটু বেশি বেশি বলস। প্রশাসনের বহুত হেডাম, সো সাবধান।’

আসাদ মৃধা লিখেছেন, ‘কাজ নাই কি করবে বন্ধুদের সাভির্স দিচ্ছে….. মাস শেষে তেল খরচ লাখ/কোটি দেখাইয়া দিলেই হবে।’ সাঈয়েদ নোমা লিখেছেন, ‘ওরা চবির ভবিষ্যৎ ডিন। সো গাড়ি নিয়ে চাইলে ওরা চান্দের দেশেও যাইতে পারে।’

রুমান হোসাইন আরমান লিখেছেন, ‘লজ্জা! উপাচার্য মহোদয়ের কন্যা কি এতই গরীব যে ভার্সিটির সম্পদ তার বন্ধুদের কাজে ব্যবহার করতে হবে? অবিলম্বে উপাচার্য মহোদয়ের কন্যার জন্য আর্থিক সাহায্য তোলা হোক’। আব্দুল্লাহ আল হাসান লিখেছেন, ‘রক্ষক ই বড় ভক্ষক এখানে ভাই। কিন্তু লেকচার দেই বড় বড়। নিয়ম তো প্রথমে এরাই অমান্য করে।’

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, টিনা শাহনাজ বিভিন্ন শর্ট ফিল্ম ও সিনেমা বানানোর কাজ করেন। তার মা প্রফেসর ড. শিরীণ আখতার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদ এসব কাজে ব্যবহার করছে তিনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে এভাবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে উপাচার্য কন্যার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন কিংনা অন্যকোনো পর্ষদের দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাড়ি ব্যবহার অনৈতিক। এটি একপ্রকার দুর্নীতিও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অভিযোগ, বিভিন্ন সিনেমা বানানোর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ তিনি ব্যবহার করছেন টিনা শাহনাজ। উপাচার্যের কন্যা হিসেবে ক্ষমতার জোরে গাড়ি ব্যবহার করছেন তিনি। এভাবে গাড়ি ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই। এছাড়া তার বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলো ও দফতরে এসে ভোজনবিলাস করেন প্রায় সময়। উপাচার্যের উচিত ছিল তার কন্যার এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করা।

শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, শিক্ষক, কর্মকর্তারা রিকুইজিশন দিয়েও গাড়ি পাচ্ছেন না। শিক্ষকরা গাড়ি চাইলে পরিবহন দফতরের কর্মকর্তারা উপাচার্যকে দেখিয়ে দেন। এভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারব না।

এদিকে, উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের কন্যা টিনা শাহনাজের বিরুদ্ধে ক্ষমতা চর্চার অভিযোগও আছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রদীপ ঘোষকে নাট্যকলা বিভাগে উপাচার্য শিরীণ আখতার খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও নিয়োগ দিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উপাচার্য পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম নিয়োগই পেলেন টিনা শাহনাজের বন্ধু প্রদীপ ঘোষ। চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী হয়ে নাট্যকলা বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক পদে প্রদীপ ঘোষকে নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে সমালোচনাও।

এ বিষয়ে জানতে টিনা শাহনাজের মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য প্রফেসর ড. শিরীণ আখতারের মোবাইলে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর মনিরুল হাসান বলেন, ‘আমি কেন গাড়ির অনুমতি দিতে যাব। গাড়িটি ভালোবাসার প্রীতিলতা নামে একটি শর্ট ফিল্মের শুটিংয়ের জন্য উপাচার্য মহোদয় নিজেই অনুমতি দিয়েছেন অনেক আগে। স্বল্প বাজেটে সিনেমা হওয়ায় গাড়িটি ব্যবহার করতে উপাচার্য অনুমতি দিয়েছেন। শুটিংয়ের কাজ প্রায় শেষের দিকে।’

জানা গেছে, ভালোবাসার প্রীতিলতা সিনেমার নির্বাহী প্রযোজক উপাচার্য কন্যা টিনা শাহনাজ। এর আগে তিনি ‘শাটন ট্রেন’ সিনেমার সহকারী পরিচালক ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *