খুলনার চাঞ্চল্যকর কাশেম হত্যা মামলাঃ আলোচনায় হাজিবাড়ির এলু

বিশেষ প্রতিনিধিঃ দুই যুগ পরে খুলনার চাঞ্চল্যকর শেখ আবুল কাশেম হত্যা মামলায় আদালতে গেলো মঙ্গলবারে বক্তব্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন নিহতের ভাইপো, সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক এজিএস আলহাজ্জ শেখ মনিরুজ্জামান এলু। আসামী পক্ষের আইনজীবীদের বিরোধীতা স্বত্বেও আদালতে শেখ এলু গেলো ২৬শে জানুয়ারি দীর্ঘ ৪০ মিনিটের মতো বক্তব্য রাখেন। বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত ধৈর্য ও মনোযোগ দিয়ে এলুর বক্তব্য শুনেন। ৯০ এর পর থেকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে এলু রাজনীতিতে এক রকম নিস্ক্রিয় আছেন। ব্যবসা বাণিজ্য ও ধর্ম কর্মেই দিন চলে যায় দুই সন্তানের জনক ৫২ বছর বয়স্ক এলুর।একজন আইনজীবীর মতোই যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে মেধাবী এলু সেদিন আদালতের নজরে আসেন।

 

৯৫ সালে ২৫শে এপ্রিল জাতীয় পার্টি খুলনা মহানগর শাখার তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ আবুল কাশেম তার ড্রাইভার মিখাইলসহ খুলনা সদর থানার পাশে প্রকাশ্য দিবালোকে নিহত হন। খুলনা ও খুলনার বাইরে শেখ আবুল কাশেম দল মত নির্বিশেষে ছোট বড় সবার কাছেই খুব জনপ্রিয় ছিলেন। রাজনীতির বাইরে শেখ আবুল কাশেম খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতিও ছিলেন এক সময়ে।

 

এলু আদালতকে জানান, স্পর্শকাতর ও চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলা গত দুই যুগের মতো স্টে ছিল।আদালতে দেয়া বক্তব্য মতে, সিন আনসিন আসামীরা সমাজে অর্থ, প্রভাব- প্রতিপত্তি, সামাজিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির কারনেই প্রায় দুই যুগের মতো এই মামলার কার্যক্রম স্টে ছিল। এদিকে আদালতে এলুর দেয়া যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য সারা খুলনায় নাড়া দিয়েছে। এলুর মর্মস্পর্শী কান্নাজড়িত কন্ঠে বক্তব্য ছোট বড়, দল মত নির্বিশেষে কম বেশী সবাইকে স্পর্শ করেছে। কান্না জড়িত কন্ঠে এলু আদালতকে বলেন, আমার আমাদের কি বিচার চাইবার অধিকার নেই? নিজের নিরাপত্তা প্রশ্নে এলু বলেন, আমি নিজেও জানিনা, এখান থেকে আমি বাসায় ফিরে যেতে পারব কিনা, আমার কিংবা কাশেম চাচার সন্তান বা পরিবারকে দেখতে পারব কিনা? এলুর এমন আবেগ ঘনিত আহাজারি বক্তব্যে আদালতে পিন পতন নিস্তব্ধ ছিল। স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে ৮০ র দশকের এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় রাজপথের নেতা এলু আদালতের কাছে বিনয়ের সাথে জানতে চান, আমরা তো কাশেম চাচা মারা যাবার পরে কাজি আমিন চাচার নামে কোনও মামলা করিনি, তার নামে পুলিশের কাছে কোনও তামাদি ওয়ারেন্ট ছিল না।

 

কিন্তু খুলনাবাসী দেখল, কাশেম চাচা মারা যাবার পরপরইে কাজি আমিন চাচা রাতের আঁধারে খুলনা থেকে পালিয়ে গেলেন। আদালতকে এলু বলেছেন, বিজ্ঞ আদালত, আপনারা এটুকুই খোঁজ নিন না, তিনি কেন পালালেন, কোথায় ছিলেন দেড় বছর। এলু আদালতকে আরও বলেন, চার্জশীটভুক্ত আসামীদের দেয়া জবানীতেই কাজি আমিনের নাম এসেছে। বিজ্ঞ আদালতকে এলু বলেন, কাজি আমিন একজন রাজনীতিক। সমাজের সম্মানি ব্যক্তি, খুলনা চেম্বারের কয়েক দফায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, খুলনার শীর্ষ ধনী অথচ খুনিদের মুখে মুখে তার নাম। তিনি কাশেম চাচা হত্যার পরিকল্পনাকারী, অর্থ যোগানদাতা। এলুর দেয়া বক্তব্যমতে মতে, তিনি আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সাথে সম্পর্ক মেইন্টেইন করে চলেন।

 

এলু বলেন, কাশেম হত্যা মামলায় কাজি আমিন একজন মাস্টার মাইন্ড। এর আগের চার্জশীটে তার নামও ছিল কিন্তু প্রভাব খাটিয়ে রাজনৈতিক মামলা এমন অজুহাত দেখিয়ে তিনি এই মামলা থেকে তার নাম প্রত্যাহার করে নেন। আদালতের কাছে এই মামলায় আবারও তার নাম সংযুক্ত করতে এলু আদালতে আবেদন জানান। আদালতে, এলু জানান, মামলার বর্তমান অবস্থান মতে কাজি আমিন ছাড়া এই মামলার বিচার করা হবে প্রহসনের, কৌতুকের। কাজি আমিনকে আসামীর তালিকা থেকে বাদ দিয়ে এই মামলার বিচারের আমাদের প্রয়োজন নেই। এলু বলেন, এই মামলায় খুনিদের মুখে তার নাম আসায় খুলনাবাসীর সাথে সাথে আমরাও বিস্মিত, লজ্জিত।

 

এলুর এমন গুছানো বক্তব্য বিজ্ঞ আদালত অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনেন, এর মধ্যেই এলুর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে কেএমপিকে নির্দেশ দিয়েছে।আদালতের নির্দেশে কেএমপিও এলু ও তার পরিবারকে সার্বিক নিরাপত্তা দিতে সম্মত হয়েছে। এলু আদালতকে আরও জানান, কাশেম চাচার খুনের বিচার চাইতে গিয়ে খুলনা আওয়ামীলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাড মঞ্জুরুল ইমাম, আওয়ামীলীগের মেয়র প্রার্থী এস এম এ রব, যুবলীগের নেতা বিথার খুন হয়েছেন। এদিকে কাজি আমিনকে নিয়ে এলুর এমন বক্তব্যে খুলনার রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় বয়ে যায়। শহর ধরেই চলছে এই বক্তব্যের বিশ্লেষণ। চলমান সময়ে কাজি আমিন খুবই প্রভাবশালী একজন রাজনীতিক। সব সময়ের জন্যই তিনি রাজনীতিতে এক রহস্যময় পুরুষ।

 

খুলনা ও খুলনার বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ চলছে তার। ঠিকাদারি ও চেম্বার পলিটিক্সে তিনি খুলনাতে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অঘোষিত রাজা। দুই জায়গাতেই তার একচ্ছত্র আধিপত্য। সদ্য ঘোষিত আওয়ামীলীগের মহানগর কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি। আগামীতে খুলনা সিটির মেয়র নির্বাচন করবেন এমন জনশ্রুতি আছে শহর জুড়ে। গেলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আট থেকে দশ জন কমিশনারকে বিএনপি থেকে ভাগিয়ে এনে আওয়ামীলীগে ভিড়িয়ে দিয়ে তিনি রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেন। এই জন্য তিনি দলে কারো কারো কাছে নিন্দিত, কারো কারো কাছে নন্দিত। আওয়ামীলীগ ও দলের বাইরে তিনি বড় ভাই হিসাবে শহর জুড়ে স্বীকৃ্ত‌ সমাদৃত।

 

সদর থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাড সাইফুল ইসলাম গেলো বছরে তার নামে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে এক জিডি করলে কাজি আমিন সেই সময়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন। জনশ্রুতি আছে, অ্যাড সাইফুল তার কারণেই খুলনা চেম্বার ও নৌ পরিবহন মালিক সমিতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। সাইফুলের মতো আরও অনেক ব্যবসায়ী কাজি আমিনের কারনে খুলনা চেম্বারে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন এমন অভিযোগ শহর জুড়েই আছে। তার পরেও সব কিছুই গুছিয়ে এনেছিলেন কাজি আমিন ঠিক সেই সময়ে প্রতিপক্ষ প্রয়াত শেখ আবুল কাশেমের ভাইপো এলুর কারনে আজ আবার রাজনৈতিক ও সামাজিক এক সংকটে পড়েছেন কাজি আমিন। নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে তার সামাজিক অবস্থান। বাদী পক্ষের দাবিমতে, মামলায় যাতে নাম আবার না আসে সেটা আইনগতভাবে মোকাবলার প্রস্তুতির পাশাপাশি বাদিপক্ষের সাথে নেগোসিয়েটের চেষ্টা করছেন। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ক্ষমতাসীন সলের এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর কাজি আমিনের হয়ে মামলা মিমাংসার জন্য এলুর বাসায় সকাল বিকাল দৌড় ঝাপ করছেন। আত্মীয়তার সুবাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে আলোচিত এই কাউন্সিলর কাশেম হত্যা নিয়ে আপোষের আলোচনা করলেও এলু সাড়া দেন নি। এমনকি তার সাথে সৌজন্যতার খাতিরে মিনিমাম হায় হ্যালো পর্যন্ত এলু করেন নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *