খুলনা জেলা পরিষদঃ সরকারি অর্থে রাজকীয় স্টাইলে তিনি পাখি পোষেন

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

খুলনা জেলা পরিষদে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা এস এম মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে এবার সরকারি অর্থে রাজকীয় স্টাইলে পাখি পোষার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে তিনি এসব পাখি পোষেন। পরিচিতদের সেখানে যেতে মানা। অভিযোগকারীরা জানান, জেলা পরিষদের কোয়ার্টারে বসবাসরত নিজের বাসার ছাদে তিনি দেশি বিদেশি নানা প্রজাতির পাখির এই খামার করেছেন।

সেখানে জেলা পরিষদে কর্মরত নিম্ন পদস্থ একাধিক কর্মচারী তাদের নির্দিষ্ট ডিউটির বাইরেও দিন রাত সময় দেন। জনশ্রুতি আছে, এই জন্য জেলা পরিষদ থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ মিলেছে। কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে এই পাখি পোষা প্রজেক্ট চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা এমন তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেছেন।

তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান মঙ্গলবার সেল ফোনে প্রথম সময়কে জানান, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সরকারি ওই কোয়ার্টারে থাকেন, যার রক্ষনাবেক্ষন জেলা পরিষদ থেকেই মেইনটেইন করা হয়। পাখি পালনের বিষয়টি তার নলেজে নেই এমন অফিসিয়ালি বক্তব্য দেবার পাশাপাশি তিনি জোর দিয়েই বলেন, সেখানে যা কিছু খরচ হয়েছে তা মন্ত্রনালয় থেকে অনুমোদন নিয়েই করা হয়েছে।

পাখি পোষা বাবদ কত টাকা ব্যয় হয়েছে, প্রকৃত টাকার অংক তাৎক্ষনিকভাবে তিনি বলতে পারেন নি। তবে, কোনও অনিয়ম হয়নি এমন দাবি এই কর্মকর্তার। পাখি পালনের বিষয়টি তিনি স্বীকার বা অস্বীকার না করে এই প্রতিবেদককে বারবার তার অফিসে এসে কথা বলার অনুরোধ জানান। ডজন ডজন অভিযোগ স্বত্বেও এস এম মাহবুবকে কেনও আপনারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিইও জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত সাপেক্ষে তিনি বিচারের সম্মুখীন হবেন, তাকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। তিনি নিজেও এই বিষয়ে সোচ্চার আছেন বলে জানান।

আলাপকালে তিনি জানান, এস এম মাহবুবের কাছে তিনি, অফিস বা অন্য কেউই জিম্মি নন। অন্য দিকে, খুলনা জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান চৌধুরী রায়হান ফরিদ সরকারি অর্থে পাখি পোষার বিষয়টি তার জানা নেই বলে জানান। রায়হান ফরিদ জানান, তিনি এই বিষয়টি খোজ নেবেন, অনিয়ম হয়ে থাকলে পরিষদের পরবর্তী সভায় অভিযোগ হিসাবে পাখি পোষার বিষয়টি তুলবেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আলোচিত ও বিতর্কিত প্রশাসনিক এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ চলমান।

ছাত্রলীগ নেতাকে প্রহার, মুক্তিযোদ্ধাকে লাঞ্চিত করার অভিযোগের পাশাপাশি দুদকে সাতক্ষীরাতে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তাকে বাদ দিয়ে অন্য দুই জন অধস্তন কর্মচারীকে আসামি করায় উচ্চ আদালত ২৪ শে ফেব্রুয়ারি এস এম মাহবুবকে তলব করেছে। এর বাইরেও একাধিক মামলা উচ্চ আদালতে চলমান। অভিযোগ রয়েছে, নিজের পকেট ভারি করতে এইচ এস সি পাশ এই কর্মকর্তা অফিসের কম্পিউটার সচল করতে গিয়ে বড় ধরনের ঘাপলা করেছেন।

সেখানেও মন্ত্রনালয়ের কোনও অনুমোদন নেন নি। যে পরিমান টাকা কম্পিউটার সচল ও মেরামত করতে তিনি ব্যয় দেখিয়েছেন তাতে তিন গুন কম্পিউটার কেনা যায় এমন আলোচনা অফিস অভ্যন্তরে ওপেন সিক্রেট। একইভাবে অফিসের ক্রোকারিজ কিনতে গিয়েও তিনি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। প্রাপ্ত সুত্র বলেছে, rfq অর্থাৎ রিকোয়েস্ট ফর কোটেশন মতে ঠিকাদাররা কোটেশন দেবে, প্রকাশ্যে টেন্ডার আহবান করা হবে, কিন্তু ক্রোকারিজ কেনার বেলায় সেই সব কোনও নিয়ম নীতি অনুসরণ করা হয়নি। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের অগোচরে কম্বল বিতরনের পাশাপাশি জেলার ১০টি ডাক বাংলোতে ২ লাখ টাকা করে বরাদ্দ থাকলেও কোনও ডাক বাংলোতেই কাঙ্ক্ষিত টাকা খরচ করা হয়নি।

নানা ছল চাতুরি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন তিনি ও তার সিন্ডিকেট। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, সঠিকভাবে তদন্ত করলেই এসব অনিয়ম বের হয়ে আসবে। থলের বিড়ালও বের করা যাবে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে তিনি ব্যক্তিগত দুইজন বডি গার্ড নিয়ে সব সময়েই চলাফেরা করেন। সবাইকে জানান দেন তিনি খুলনা জেলা পরিষদে একজন বড় হর্তা কর্তা। চাউর আছে, তিনি অনেকটা ছায়া চেয়ারম্যান হিসাবেই চলাফেরা করেন। খুলনা জেলা পরিষদে চাকরি করলেও খুলনাকে বাই পাস করে সাতক্ষীরার লোককে তিনি চাকরি দিয়েছেন।

এরা হলেন ড্রাইভার সজিব ও অফিস সহকারী সোহাগ। ড্রাইভার সজিব সাতক্ষীরাতে এস এম মাহবুব কর্মরত থাকাকালীন তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার ছিলেন। সাতক্ষীরা জেলা পরিষদে এস এম মাহবুব তাদেরকে বাধার মুখে চাকরি দিতে ব্যর্থ হলে পরে তাদেরকে খুলনাতে চাকরি দেন। সেখানেও বড় ধরনের লেনদেন হয়েছে এমন অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, অরগানগ্রামের বাইরে তিনি তার নিজের দপ্তরে ৫ থেকে ৭ জন কর্মচারীকে তার নিজের ও বাসার কাজে সব সময়েই ব্যতিব্যাস্ত রাখেন যা একেবারেই নজিরবিহীন।

কর্মরত এসব একাধিক কর্মচারী অফিসের বাইরে তার ওখানে ডিউটি করার কথা স্বীকারও করেছেন। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা প্রায়শই জেলা পরিষদের নির্বাচিত নেতাদের নিয়ে খুলনার বিলাস বহুল রেস্টুরেন্টে আড্ডা দেন, সেখানে ডিনারের হাজার হাজার টাকা বিল দেন, যা তার আয়ের সাথে সামঞ্জস্য নয়। সেখানে, প্রতি পার্টিতেই একাধিক মহিলা নেত্রিরা থাকেন যা সংশ্লিষ্ট রেস্টুরেন্টের সিসি ক্যামেরা চেক করলেই তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *