খুলনা জেলা আ”লীগঃ শীর্ষ দুই নেতার বিপরীতে দলের এক গ্রুপ নেতা সোচ্চার

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

খুলনা জেলা আওয়ামীলীগে বড় ধরনের নিস্তব্ধতা চলছে। দুই নেতার ব্যক্তিগত বিরোধ এবং বাহাস সেখানে সবসময়েই বিদ্যমান। তাদের বাহাসের কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এমন অভিযোগের পাল্লা ক্রমেই ভারি হচ্ছে। দলের একদল নেতা ভেতরে ভেতরে তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। অন্তত দুটি গোপন বৈঠকে তারা এর মধ্যেই মিলিত হয়েছেন। নিজেদের মধ্যে শলা পরামর্শ করছেন। জেলা পর্যায়ের দলের এই দুই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে একটি তৃতীয় শক্তি দাঁড় করাতে চায় এই অংশটি। দুই নেতার সার্বিক কর্মকাণ্ড তারা ইতমধ্যেই খুলনার রাজনৈতিক অভিভাবক হিসাবে সমাদৃত শেখ পরিবারকেও মৌখিক ভাবে অবহিত করেছেন।
বৈঠক সুত্র জানায়, চলমান ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন বানিজ্যের অভিযোগের পাশাপাশি সম্প্রতি ঘোষিত বর্তমান জেলা কমিটি নিয়েও তারা ক্ষুদ্ধ। তাদের অভিযোগ, এভাবে একটি দল চলতে পারে না। পলিটিক্যালি অনেস্ট হিসাবে পরিচিত একজন সিনিয়র নেতাকে মুরুব্বি মেনে বিক্ষুদ্ধ এই অংশটি ধাপে ধাপে এগুচ্ছে। লকডাউন আরও শিথিল হলে জেলা শাখার চলমান নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে অনাস্থা আনবে, একই সঙ্গে তাদের অভিযোগের সুনির্দিষ্ট তথ্য উপাত্ত দলের সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর দেয়া লিখিত অভিযোগে আনবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই তথ্য দলের একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন। জানা গেছে, এই উদ্যোগের সাথে বেশ কয়েকজন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, থানা কমিটির সভাপতি, সম্পাদক, পদ বঞ্চিত নেতা ও নৌকা বঞ্চিত ইউপি নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী, জেলার রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী অন্তত তিনজন এমপি, জেলা কমিটির একাধিক সহ সভাপতি, যুগ্ম সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্যরাও থাকবেন এমন আভাস পাওয়া গেছে। দলের সভাপতি, সম্পাদকের সাথে অতীতে ছিলেন এমন নেতারাও এই অংশের সাথে হাত মিলিয়েছেন।
আলাপকালে নেতারা জানিয়েছেন, জেলা সভাপতি বিভিন্ন সময়ে দলের নেতাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে আসছেন। দলের একাধিক সভায় তিনি এমপিদের সাথেও প্রকাশ্যে দুর্ব্যবহার করেছেন এমন অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। বিষয়টি তাৎক্ষনিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পরে তার বয়স হয়েছে এমন যুক্তি দেখিয়ে মীমাংসা করা হয়। সভাস্থলেই ভিপি ছিলেন, এমন একজন সাবেক ছাত্রনেতা প্রকাশ্যে বলেন, বয়স হলে এমন দায়িত্বে তার থাকার দরকার কি? আবার দলের সভাপতির সঙ্গে সাধারণ সম্পাদকের সম্পর্ক খুবই শীতল। প্রাপ্ত অভিযোগ মতে, সভাপতি ডাইনে গেলে সাধারনণ সম্পাদক বামে চলেন। বাঁধ ভাঙ্গার ঘটনায় খুলনা- ৬ আসনের এমপি আকতারুজ্জামান বাবুকে হেনস্তার ঘটনায় কেন্দ্র থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ সাধারণ সম্পাদক অনুসরন করলেও সভাপতির এই বিষয়ে অনিহা ছিল। পরে সভাপতির ইচ্ছার বাইরেই সাধারণ সম্পাদক তদন্ত কমিটি গঠন ও তাদেরকে দিয়ে তদন্ত শেষ করে আনেন। এই ঘটনায় তাদের মধ্যকার দূরত্ব প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। তাদের দুজনার মধ্যে সভার মধ্যেই বাহাসের ঘটনা নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার।

জানা গেছে, জেলা কমিটি গঠনের পরে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এক সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সভা শেষ করেছেন, এমন উদাহরন বিরল, নেই বললেই চলে। নানামুখী এসব ঘটনায় দলের অভিযোগকারী নেতারা বিব্রত, বিস্মিত, ক্ষুদ্ধ একই সঙ্গে লজ্জিত।
বিব্রত এসব নেতারা একে অপরকে সেল ফোনে আলাপকালে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমরা কাদের পেছনে রাজনীতি করছি। দলকে একটি রাজনৈতিক শেভে তারা আনতে চায়।

অভিযোগকারীদের মতে, বর্তমান জেলা কমিটিতেও বিতর্কিত লোকজনের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যাতে দলের বদনাম হচ্ছে। এই অংশ বলছে, অনৈতিকভাবে কমিটি গঠনের দায়ভার আমরা নেব কেন? এই বদনামের ভাগীদার আমরা হব কেন? একইভাবে গত উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনের সময়েও টাকার খেলা হয়, এতে দলের ৪ জন প্রার্থী পরাজিত হয়। ক্ষমতায় আওয়ামীলীগ অথচ এসব প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক পেয়েও পরাজিত হন, দল এতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আজ অবধি দলের একটা মুল্যায়ন সভা পর্যন্ত হয়নি। দলকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন, তাদেরকে তিরস্কারের বদলে পুরস্কার করা হয়েছে।

বিক্ষুদ্ধ এই অংশের মতে, দলের দুই নেতা একে অপরের বিরোধিতা করলেও কমিটি বানিজ্য ও মনোনয়ন বানিজ্যের (তাদের ভাষায়) সময়ে আবার নাটকীয়ভাবে এক। নেত্রী বরাবর দেয়া অভিযোগপত্রে তাদের ব্যাংক একাউন্ট, স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব নেয়ার জন্য আবেদন জানানো হবে। তবে বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় কেউ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে চান নি।

এই বিষয়ে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ হারুন বলেছেন, দল মানেই একটি পরিবার, কারা বিক্ষুদ্ধ আমার জানা নেই, পার্টি ফোরামে তারা ওপেন বললেই তো পারে, কথা বলার উপযুক্ত জায়গাই তো পার্টি ফোরাম। তিনি বলেন, আমার রাজনীতির বয়স ৬০ বছরের বেশি, কম বেশি সবারই মুরুব্বী, আমি তো ধমক দিতেই পারি, দলের সবাইকে আদরও তো করি। দলের সাধারণ সম্পাদকের সাথে তার কোনও দূরত্ব নেই দাবি করে প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা শেখ হারুন বলেন, ও সবে দায়িত্বে এসেছে আর আমার রাজনৈতিক জীবনের বয়স ৬০ বছর, আমরাও রাজনীতির শুরুতে তোফায়েল ভাই, আমু ভাইদের কাছে ধমক ধামকি খেয়েই রাজনীতি শিখেছি। সুজিতকেও আমি শেখাচ্ছি।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারন করে দল করে আসছি, শেখ হাসিনা আমার নেত্রী, সেই ছাত্রজীবন থেকে সারা জীবন এক দলই করে এসেছি। দলকে সমুন্নত রাখতে কোনও আপোষ করিনি। দলের কোনও ক্ষতি আমাকে দিয়ে হয়নি, হবেও না। কমিটি বানিজ্য বা মনোনয়ন বানিজ্য করা হয়নি এমন মন্তব্য করে শেখ হারুন বলেন, দলের স্বার্থেই যাকে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। নিজে কোনও আর্থিক সুবিধা নেননি এমন দাবি শেখ হারুনের।

অন্য দিকে, দলের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, অ্যাড সুজিত অধিকারী দলের সভাপতিকে ইঙ্গিত করে প্রথম সময়কে বলেছেন, যার যা সম্মান তাকে দিতে হবে। এসেই এমপিদের নামে সমালোচনা করা, তাদেরকে পাবলিক প্লেসে টিচ করা ঠিক না। তিনি বলেন, আমি তো দলের সাধারণ সম্পাদক, যেখানে শেখ হাসিনা স্বাক্ষর করেছেন, আমি তো তার সেক্রেটারী না। কমিটি ও মনোনয়ন বানিজ্য হয়নি এমন দাবি করোনাতে অসুস্থ হয়ে নিজ বাসায় কোয়ারাইন্টাইনে থাকা অ্যাড সুজিতের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *