কর্নেল তাহের: ভ্রান্তি এবং বিশ্বাসঘাতকতা

অনলাইন ডেস্কঃ

আজ ২১ জুলাই। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসি দেওয়া হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে। কর্নেল তাহের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই শুধু নন, তিনি মুক্তিযুদ্ধে তার একটি পা হারিয়েছিলেন। একজন পঙ্গু মানুষকে ফাঁসি দেওয়া অমানবিক এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তারপর তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে, এই বিচারটি ছিল একটি তামাশা এবং প্রহসনের বিচার। বিচারের দীর্ঘদিন পর পঞ্চম সংশোধনীতে চ্যালেঞ্জ করে রিট পিটিশনে কর্নেল তাহেরের বিচারকে একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে আদালতে চিহ্নিত করেছে এবং সেই বিবেচনায় এই দিন কর্নেল তাহেরকে হত্যা করা হয়েছিল বলেই আইনের দৃষ্টিতে পরিগণিত হচ্ছে। কর্নেল তাহেরের সঙ্গে জিয়াউর রহমান যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তা ইতিহাসে নজিরবিহীন এবং এর মাধ্যমে রাজনীতিতে বিশ্বাসঘাতকতার এক নতুন উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। কর্নেল তাহেরের কারণেই ৭ ই নভেম্বরের সামরিক ক্যু সম্পাদিত হয়েছিল। সিপাহীদেরকে উস্কে দিয়ে কর্নেল তাহেরেই জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেছিলেন। আর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে তাহেরকেই হত্যা করে প্রমাণ করেছিলেন স্বৈরাচারী রাজনীতিতে বিশ্বাস বলে কোন শব্দ নেই। কিন্তু কর্নেল তাহেরের এই পরিণামের জন্য তার অতীত রাজনীতি যে কম দায়ী নয় সেটা আজ অকপটে স্বীকার করতে হয়। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যারা বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছিলেন, বাংলাদেশের অগ্রগতি এবং অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার জন্য কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে কর্নেল তাহের ছিলেন অন্যতম। কর্নেল তাহের বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য জাতির পিতার বিরুদ্ধে গণবাহিনী গঠন করেছিলেন নাকি তিনি সত্যি সত্যি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের এক রঙিন স্বপ্ন দেখেছিলেন সেটি অমীমাংসিত প্রশ্ন।

ইতিহাস নিশ্চয়ই সেই প্রশ্নের উত্তর একদিন খুঁজে বের করবে। কিন্তু কর্নেল তাহেরের রাজনীতি যে ভ্রান্ত ছিল, কর্নেল তাহের যে দেশের ক্ষতি করেছিলেন সেটি আজ জাসদের নেতারাও অকপটে স্বীকার করে। কর্নেল তাহের সেই সময় জাসদে একটি সশস্ত্র উইং করেছিলেন। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারকে হটিয়ে দেয়া হয়েছিল তার লক্ষ্য। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হচ্ছে যে, খুনি ফারুক-রশিদরা যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন সেই পরিকল্পনার কথা তাহের জানতেন এবং এ ব্যাপারে তার সম্মতি ছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধু যখন পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট হত্যা করা হয় সেই হত্যার পর কর্নেল তাহের হলেন সেই ব্যক্তি যিনি বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ যেন সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হয়। তার লাশ দাফন করা হয় তাহলে সেখানে মাজার হবে। অর্থাৎ এইরকম একটি নিষ্ঠুর উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে, তাহের কতটা বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী ছিলেন।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এর পেছনে আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় ষড়যন্ত্র ছিল। এই ঘটনায় সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের একটাই এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশেকে আবার পাকিস্তান বানানোর। কর্নেল তাহের সেই পরিকল্পনার অংশ হয়েছিলেন তার ভ্রান্ত রাজনীতির জন্য। কর্নেল তাহের হয়তো মনে করেছিলেন যে, যদি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় তাহলে হয়তো তার বিপ্লব সফল হবে। এটি ছিল তার ভ্রান্ত রাজনীতি। আর ভ্রান্ত রাজনীতির মূল্য তাকে দিতে হয়েছে তার জীবন দিয়ে। খালেদ মোশাররফ যখন অভ্যুত্থান করে জিয়াউর রহমানকে বন্দী করেছিলেন এবং একটি নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখনই তাহেরের গণবাহিনীর সমর্থকরা সেনা অভ্যুত্থান ঘটায় এবং কর্নেল তাহেরকে হত্যা করেন। এরপরই তারা জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করে এবং সেনাপ্রধান বানায়। কর্নেল তাহের হয়তো চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমানকে নেতৃত্বে রেখে বিপ্লব সম্পন্ন করতে। কিন্তু কর্নেল তাহেরের ভ্রান্ত রাজনীতি যে শুধু ভুলই করে তার প্রমাণ হলেন জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে তাহেরের প্রহসনের বিচার করে ইতিহাসে প্রমাণ করেছিলেন ভ্রান্তির রাজনীতি কেবল বিশ্বাসঘাতকতাকেই আলিঙ্গন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *